বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন,পহেলা বৈশাখ। প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল বাংলাদেশে এবং ১৫ই এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটি উদযাপিত হয়

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন,পহেলা বৈশাখ। প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল বাংলাদেশে এবং ১৫ই এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটি উদযাপিত হয় অপার আনন্দ আর উৎসবের মাঝে। রমনার বটমূল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠ পর্যন্ত — বাংলা সংস্কৃতির এই মহাউৎসব যেন বাঙালি জাতির প্রাণের স্পন্দন।
কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন এই বৈশাখ উৎসব কীভাবে শুরু হয়েছিল? কে প্রবর্তন করেছিলেন বাংলা সন? কোথা থেকে এলো মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা আর পান্তা-ইলিশের সংস্কৃতি? আজকের এই লেখায় আমরা সেই দীর্ঘ ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটব।

বাংলা সনের জন্ম সম্রাট আকবরের হাত ধরে”পহেলা বৈশাখের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ষোড়শ শতাব্দীতে। মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬–১৬০৫) হিজরি সন ব্যবহার হতো সরকারি কাজে। কিন্তু সমস্যা ছিল হিজরি সন চাঁদের গণনায় চলে,তাই প্রতি বছর ঋতু পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতো না।কৃষি-নির্ভর বাংলায় খাজনা আদায় ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণ করা হয়ে উঠছিল কঠিন।
body(“তখন সম্রাট আকবর তাঁর প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে নির্দেশ দিলেন একটি নতুন সন প্রবর্তন করতে। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৫৮৫) সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ৯৬৩ হিজরি থেকে গণনা শুরু করে তৈরি হলো ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ বা ফসলি সন। পরবর্তীতে এটিই পরিচিত হয় ‘বাংলা সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ নামে।

বাংলা বর্ষপঞ্জি আসলে সূর্যের গতি অনুসরণ করে তাই বাংলা নববর্ষ সবসময় একই ঋতুতে আসে।
“বছরের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারিত হলো বৈশাখ। আর বছরের শুরু উপলক্ষে জমিদার ও রাজারা প্রজাদের জন্য মেলা ও উৎসবের আয়োজন করতেন এটিই পহেলা বৈশাখের উৎসবের বীজ।

পুণ্যাহ ও হালখাতা ব্যবসার উৎসব”


“মুঘল আমল থেকেই পহেলা বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব পালিত হতো। জমিদাররা এই দিনে প্রজাদের কাছ থেকে বার্ষিক খাজনা গ্রহণ করতেন। প্রজারা নতুন কাপড় পরে, মিষ্টি নিয়ে জমিদার বাড়িতে যেতেন। জমিদারও তাদের মিষ্টি ও উপহার দিতেন। এই পারস্পরিক লেনদেনের উৎসবই ধীরে ধীরে রূপ নেয় ‘হালখাতা’র আচারে।
হালখাতা মানে হলো নতুন হিসাবের খাতা খোলা। বাংলার ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে পুরনো বছরের বাকি হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতায় লেখা শুরু করতেন। দোকানে দোকানে মিষ্টি বিতরণ, ক্রেতাদের সাথে মিলন আজও বাংলাদেশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই ঐতিহ্য পালন করে।

ব্রিটিশ আমল সংস্কৃতির নতুন মোড়


ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারি প্রথা পরিবর্তিত হলেও পহেলা বৈশাখের উৎসব থেমে যায়নি। বরং উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক কবি-সাহিত্যিক এই দিনটিকে বাঙালি পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলেন।”),
রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান ‘এসো হে বৈশাখ’ এই সময়েরই সৃষ্টি। শান্তিনিকেতনে তিনি বৈশাখী উৎসব পালন শুরু করেন বিশেষ আঙ্গিকে প্রকৃতির মাঝে, গান ও নৃত্যের সাথে। এই ধারাটি পরবর্তীতে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।”),

১৯৬৭ সাল ছায়ানটের বিপ্লব

বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো ১৯৬৭ সাল। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাংলা সংস্কৃতিকে দমন করার চেষ্টা করছিল। এই প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ রমনার বটমূলে প্রথমবার সংগঠিতভাবে বৈশাখী ভোরের অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
এসো হে বৈশাখ’ গানের সাথে ভোরের আলোয় বাঙালির এই জাগরণ ছিল কেবল সাংস্কৃতিক উৎসব নয় এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও একটি অংশ। আজও রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ বাংলাদেশের সবচেয়ে আইকনিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর একটি।”),

মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি

মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন, তবে তার শিকড় প্রাচীন লোকশিল্পে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রথমবার এই শোভাযাত্রার আয়োজন করেন। পহেলা বৈশাখের সকালে বিশাল মুখোশ, পেঁচা, বাঘ, হাতির মতো লোকজ প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল বের করা হয়।
প্রতিটি প্রতীকের আলাদা অর্থ আছে পেঁচা জ্ঞানের প্রতীক,বাঘ শক্তির, হাতি সমৃদ্ধির।মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল বার্তা হলো অন্যায়,অশুভ শক্তিকে তাড়িয়ে নতুন বছরে আলো ও মঙ্গল আনা।
২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবজাতির অস্পর্শযোগ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (Intangible Cultural Heritage) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এটি বাংলাদেশের জন্য এক অসামান্য গৌরব।

পান্তা-ইলিশ থেকে বৈশাখী ফ্যাশন”


পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ ভাজা এটি বর্তমানে পহেলা বৈশাখের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। তবে ইতিহাসবিদরা বলেন, এই রীতিটি তুলনামূলকভাবে আধুনিক এবং শহুরে সংস্কৃতির অংশ। গ্রামীণ বাংলায় মানুষ এমনিতেই পান্তা ভাত খেতেন তাই বৈশাখী সকালে সেটা খাওয়া ছিল স্বাভাবিক।
পোশাকের ক্ষেত্রে লাল ও সাদার সমন্বয় পহেলা বৈশাখের ‘ইউনিফর্ম’ হয়ে গেছে। মেয়েদের লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, পুরুষদের পাঞ্জাবি, খোপায় ফুল এই পোশাক কোড বাঙালি পরিচয়ের একটি শক্তিশালী দৃশ্যমান প্রতীক।

বৈশাখী মেলা গ্রামবাংলার প্রাণ


পহেলা বৈশাখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো বৈশাখী মেলা। সারাদেশে শত শত মেলা বসে এই সময়ে। মাটির খেলনা, মুড়ি-মুড়কি, বাঁশের বাঁশি, কাঠের পুতুল গ্রামীণ কারিগরদের হাতে তৈরি পণ্যের পসরা সাজানো থাকে এই মেলায়। মেলার ঐতিহ্য বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।”),

বৈশাখ মানে শুধু উৎসব নয়


পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিনের উৎসব নয়। এটি বাঙালির ইতিহাস, সংগ্রাম, পরিচয় ও ভালোবাসার মেলবন্ধন। মুঘল সম্রাটের রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া এই সন আজ কোটি বাঙালির হৃদয়ের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানি শাসকের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ছায়ানটের গান, মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে বৈশাখের আনন্দ, ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে মঙ্গল শোভাযাত্রার গর্ব পহেলা বৈশাখ প্রতিটি বাঙালির কাছে একটি আলাদা অর্থ বহন করে।
শুভ নববর্ষ। এসো হে বৈশাখ এসো এসো। তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *